বিগত ১৫ বছরে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা একটি নিভৃত কৃষিভিত্তিক অঞ্চল থেকে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন একটি অগ্রসরমান জনপদে রূপান্তরিত হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে এই উপজেলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রামাণ্যচিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

১. কৃষিখাতে আধুনিকায়ন ও নীরব বিপ্লব: ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কৃষি, যার ওপর ৬৫.০৭% মানুষ নির্ভরশীল। ২০০৫-২০০৮ সময়কালে এই অঞ্চলে শস্যের নিবিড়তা ছিল ২৩২%, যা   বর্তমান সময়ে (২০২৩-২০২৪) বেড়ে ২৬৯%-এ উন্নীত হয়েছে।

কৃষকদের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির সাথে যুক্ত করতে এই ১৫ বছরে ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৬১ জন কৃষককে কৃষি সহায়তা কার্ড প্রদান করা হয়েছে এবং ১ লাখ ৪৪ হাজার ১১৭ জন কৃষক মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা পেয়েছেন। এই সময়ে ১ লাখ ৮৫০ জন কৃষককে বিভিন্ন কৃষি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া চা চাষে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে; বর্তমানে জেলায় ১,৪৫৭ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে যা থেকে বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা আয় হচ্ছে এবং ৩ হাজার   মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

২. শতভাগ বিদ্যুতায়ন ও জ্বালানি খাতের যুগান্তকারী উন্নয়ন: ২০০৬ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে বিদ্যুৎ গ্রাহক ছিলেন মাত্র ৯১,১১২ জন, যা এই সরকারের আমলে বেড়ে বর্তমানে ৪ লাখ ১৮ হাজার ৯১ জনে দাঁড়িয়েছে এবং উপজেলাটি শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় এসেছে।

শিল্পায়ন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২০২২ সালে সদরের জগন্নাথপুর ইউনিয়নের গৌরীপুরে ‘ইপিভি ঠাকুরগাঁও লিমিটেড’ নামে একটি ১৩২ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে।

বর্তমানে এই কেন্দ্র থেকে ১০৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে, যা সমগ্র জেলার ১১৪ মেগাওয়াটের চাহিদার প্রায় পুরোটাই মেটাতে সক্ষম।

৩. শিক্ষা খাতে ডিজিটাল রূপান্তর ও অবকাঠামো বৃদ্ধি: ২০০৬-২০০৮ সালের পরিসংখ্যানে  এই উপজেলায় মাল্টিমিডিয়া ও স্মার্ট ক্লাসরুমের সংখ্যা ছিল শূন্য, কিন্তু বর্তমানে এখানে ৬৪৩টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং ১৩১টি ডিজিটাল স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে।

উপবৃত্তি সুবিধা ৫% থেকে বাড়িয়ে ১০০% করায় শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার (Dropout) হার ১৮.৭৭% থেকে কমে মাত্র ২.৬%-এ নেমে এসেছে। উচ্চশিক্ষার জন্য ‘এম ওয়াজেদ মিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ স্থাপন করা হয়েছে।

৪. যোগাযোগ ব্যবস্থা ও মেগাপ্রকল্প: এই ১৫ বছরে এলজিইডি (LGED)-এর মাধ্যমে উপজেলায় ১,১৫৫ কিলোমিটার নতুন পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থায় গতি আনতে এশিয়ান হাইওয়ে-২ এর অংশ হিসেবে ৩৩ কিলোমিটার রাস্তা প্রশস্ত করা হয়েছে এবং শহরের ভেতরে ৬ কিলোমিটার সড়ক ডিভাইডার ও স্ট্রিট লাইটসহ চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। 

রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে; বর্তমানে ঠাকুরগাঁও রোড স্টেশন থেকে ৫টি আন্তঃনগরসহ মোট ৬টি ট্রেন ঢাকার সাথে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করছে।

৫. স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয়ণ প্রকল্প: সদর হাসপাতালকে ১০০ শয্যা থেকে উন্নত মানের অপারেশন থিয়েটার ও প্যাথলজি সেবাসহ ২৫০ শয্যার একটি অত্যাধুনিক জেনারেল হাসপাতালে উন্নীত করা হয়েছে।

এছাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে গৃহহীনদের পুনর্বাসনে বিশাল সাফল্য এসেছে; প্রথম তিন পর্যায়ে ৮,১৮৭টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মধ্যে ইতিমধ্যে ৭,৪৩৬টি পরিবারকে জমির মালিকানাসহ পাকা ঘর প্রদান করা হয়েছে।

 

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জেলা ঠাকুরগাঁও গত ১৫ বছরে (২০০৮-২০২৩) পরিণত হয়েছে সম্ভাবনার জনপদে। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদে এই জেলায় কৃষি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে। স্থানীয়রা বলছেন, ‘ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার’ জেলায় পরিণত হয়েছে ঠাকুরগাঁও। বদলে যাওয়া এই জনপদে থেকেই ভাগ্য উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছেন তারা। এখন তাদের সামনে এগিয়ে যাবার পালা।

জেলা প্রশাসন জানায়, ঠাকুরগাঁও জেলায় ১৫ লাখ ৩৩ হাজার মানুষের বসবাস। তাদের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। এখানে উৎপাদিত প্রধান কৃষিপণ্যে মধ্যে রয়েছে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পাট,  শাকসবজি, সরিষা, চিনা বাদাম, আম, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, আদা, হলুদ ও আখ। এরমধ্যে আলু, করলা ও আম বিদেশে রফতানিও হয়। ফলে উৎপাদিত এসব ফসলের ওপর জীবিকা নির্ভর করে এ জেলার বেশিরভাগ মানুষের।

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষিপ্রধান ঠাকুরগাঁওয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের নানামুখী যুগোপযোগী পদক্ষেপের সুফল পাচ্ছে মানুষ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনার ফলে জেলার মোট আবাদি জমির পরিমাণ এবং কৃষিজ পণ্যের উৎপাদন দুই দশকে বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। ২০০৫-২০০৬ থেকে ২০০৭-০২০৮ অর্থবছরে ফসলের গড় নিবিড়তা ছিল ২৩২ শতাংশ, যা বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়ে ২৬৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

তথ্য বলছে, এই জেলায় ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৬১ জন কৃষককে ‘কৃষি সহায়তা কার্ড’ প্রদান করা হয়েছে। ১ লাখ ৪৪ হাজার ১১৭ জন কৃষককে ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত জেলায় ১ লাখ ৮৫০ জন কৃষককে বিভিন্ন ধরনের কৃষি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের কারণে সরাসরি উপকার পেয়েছেন কৃষকরা।

সদর উপজেলার বাসিন্দা আমজাদ হোসেনের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৫ বছরে তার জেলায় কৃষির ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে এখন আধুনিক ব্যবস্থার কারণে  উন্নত বীজ পাওয়া যাচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকায় সেচ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। বিএনপি আমলে এমনটি ভাবা যায়নি। রাস্তাঘাট উন্নত হওয়ায় যাতায়াত সহজ হয়েছে। ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে।’

সমতলে চা বাগান

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সমতল ভূমিতে চা চাষের যাত্রা শুরু হয় প্রথমে পঞ্চগড়ে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসার পর চা উৎপাদন শুরু হয় পাশের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে। এ জেলার সবচেয়ে বেশি চা চাষ হয় বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায়। বর্তমানে এ জেলার ১ হাজার ৪৫৭ একর জমিতে চা চাষ হয় এবং তাতে বছরে ৪০ কোটি টাকা আয় হয় বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

রনবাগ ও বেউরঝাড়ি সীমান্ত ফাঁড়ির কাছে অবস্থিত ইসলাম টি এস্টেটের তত্ত্বাবধায়ক মো. একরামুল জানান, পঞ্চগড়ে চা চাষের সফলতা দেখে এখানকার মানুষ চা চাষে উৎসাহিত হয়েছেন। ফলে চা বাগান হওয়ায় এলাকার কৃষকরা লাভবান হয়েছেন।

ঠাকুরগাঁওয়ের সমতল ভূমিতে গড়ে উঠেছে চা বাগানযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন